হামজা চৌধুরী
ইংল্যান্ডের এক শহরে জন্ম নেওয়া একটি ছেলের গল্প দিয়ে শুরু করি। জন্ম বিদেশে হলেও, তার পরিচয়ের গভীরে ছিল একটি দেশের নাম — বাংলাদেশ। সেই ছেলেটির নাম হামজা চৌধুরী।
ছোটবেলা থেকেই হামজা বড় হয়েছেন একটি ধর্মভীরু, শৃঙ্খলাবদ্ধ পরিবারে। তার মা বাংলাদেশি, আর শৈশব থেকেই তিনি মায়ের দেশের সাথে যুক্ত ছিলেন। বহুবার তিনি বাংলাদেশে এসেছেন, গ্রামের বাড়িতে সময় কাটিয়েছেন, আত্মীয়দের ভালোবাসা পেয়েছেন। বিদেশে থেকেও তিনি নিজের শিকড় ভুলে যাননি। তিনি সিলেটি ভাষায় কথা বলতে পারেন, যা তার বাঙালি পরিচয়ের প্রমাণ দেয়।
ফুটবলের সাথে তার পথচলা শুরু হয় খুব অল্প বয়সেই। লেস্টার সিটির একাডেমিতে যোগ দিয়ে প্রতিদিন কঠোর অনুশীলনের মধ্য দিয়ে নিজেকে তৈরি করতে থাকেন তিনি। দলে টিকে থাকা সহজ ছিল না। প্রতিটি দিন ছিল নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার আরেকটি পরীক্ষা। ধীরে ধীরে তার পরিশ্রম ফল দিতে শুরু করে এবং অল্প বয়সেই তিনি বড় ক্লাবগুলোর নজরে পড়েন।
অভিজ্ঞতা বাড়ানোর জন্য তাকে অন্য ক্লাবেও খেলতে হয়। সেখানে তিনি শেখেন বাস্তব ফুটবলের চাপ, শারীরিক লড়াই আর মানসিক শক্তির গুরুত্ব। এই কঠিন সময়গুলোই তাকে আরও পরিণত খেলোয়াড়ে পরিণত করে। এরপর একদিন আসে সেই মুহূর্ত, যখন তিনি লেস্টার সিটির হয়ে বড় ম্যাচে মাঠে নামেন। শক্ত প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলে তিনি প্রমাণ করেন, তিনি বড় মঞ্চের জন্য প্রস্তুত।
তার খেলার ধরন ছিল শান্ত কিন্তু কার্যকর। তিনি মূলত রক্ষণভাগে দলের ভারসাম্য রক্ষা করতেন, আবার প্রয়োজনে আক্রমণেও সাহায্য করতেন। তার কাছে ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে দলের সাফল্য ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক ফুটবলের ক্ষেত্রে তার সামনে ছিল বড় একটি সিদ্ধান্ত। যেহেতু তিনি ইংল্যান্ডে বড় হয়েছেন, শুরুতে তার স্বপ্ন ছিল ইংল্যান্ডের জাতীয় দলের হয়ে খেলার। তিনি ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়েও খেলেছেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তার মনে দেশের টান আরও গভীর হতে থাকে। বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমর্থন, আর নিজের পারিবারিক শিকড়ের টান তাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
একসময় তিনি সিদ্ধান্ত নেন, তিনি খেলবেন বাংলাদেশের জন্য। এই সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। এর পেছনে ছিল অনেক কাগজপত্রের ঝামেলা, অনুমতির অপেক্ষা আর দীর্ঘ প্রক্রিয়া। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশি পাসপোর্ট পান এবং আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার অনুমতি মেলে।
২০২৫ সালে তিনি প্রথমবার বাংলাদেশের জার্সিতে মাঠে নামেন। সেই ম্যাচটি ছিল শুধু তার জন্য নয়, পুরো দেশের জন্য আবেগের মুহূর্ত। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক গোল করেন। প্রবাসে জন্ম নেওয়া একটি ছেলে আজ দেশের মানুষের গর্বে পরিণত হয়।
মাঠের বাইরে হামজার জীবনও অনেকের জন্য অনুপ্রেরণা। ম্যাচের আগে তিনি দোয়া করেন, কোরআনের আয়াত পড়েন এবং বিশ্বাস করেন, আত্মবিশ্বাসের পাশাপাশি আল্লাহর ওপর ভরসাও একজন খেলোয়াড়কে শক্ত করে। জীবনে ভুলও হয়েছে, সমালোচনাও এসেছে, কিন্তু তিনি সেগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে গেছেন।
পরিবার তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। একজন স্বামী এবং সন্তানের বাবা হিসেবে তিনি জানেন দায়িত্ব কাকে বলে। তাই মাঠে যেমন তিনি লড়াই করেন, মাঠের বাইরেও তিনি নিজের দায়িত্ব পালন করেন নীরবে।
হামজা চৌধুরীর গল্প আমাদের শেখায়, আপনি কোথায় জন্মেছেন সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো আপনি কাকে নিজের মনে করেন। বিদেশের মাটিতে বড় হলেও তার হৃদয়ে ছিল বাংলাদেশের জন্য ভালোবাসা। তার এই যাত্রা প্রমাণ করে, শিকড়ের টান কখনো হারিয়ে যায় না, আর দেশের ডাক একদিন না একদিন মানুষকে নিজের পথে ফিরিয়ে আনে।
এই ছিল হামজা চৌধুরীর গল্প — প্রবাসে জন্ম, কিন্তু হৃদয়ে লাল-সবুজ।
